• Page Views 220

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ শিক্ষা ও বৃত্তির টুকিটাকি

পাঁচ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বৃত্তি (স্কলারশিপ) কমিটিতে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমার কাজ ছিল আবেদনকারী আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা | সেই তালিকা থেকেই অনেক যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা হতো। চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো। সেখান থেকে বাছাই করা নির্দিষ্টসংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হতো। তবে বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের সিভি, ট্রান্সক্রিপ্ট, রিকমেন্ডেশন লেটার—এগুলো পড়ে, দেখে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। তা ছাড়া আমার নিজের গবেষণাগারেও কিছু বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী কাজ করছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর কথাই আপনাদের বলব।

পিএইচডির জন্য যাঁরা আবেদন করতে চান

অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডির ভর্তি এবং বৃত্তির জন্য যাঁরা আবেদন করেন, তাঁদের আবেদনপত্র দেখে প্রথমেই তাঁরা কোন দেশের বাসিন্দা, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা অস্ট্রেলীয় শিক্ষার সমমানের কি না, তা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর যে বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় তা হলো স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ভালো ফলাফল। দুটিতেই সিজিপিএ-৩.৫-এর বেশি থাকলে ভালো।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে থিসিস অবশ্যই থাকতে হবে | সেই থিসিস বা অভিসন্দর্ভ আবার নামমাত্র হলে হবে না | দুটি থিসিসই কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ পৃষ্ঠার হতে হবে (১০ থেকে ১৪ হাজার শব্দের মধ্যে) | থিসিসগুলো মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ পেলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।

ইদানীং একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। বাংলাদেশ থেকে অনেক ছেলেমেয়ে একেবারেই নামসর্বস্ব আন্তর্জাতিক জার্নালে থিসিস প্রকাশ করছে। আইএসআই বা এসসিআই (ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক ইনডেক্স বা সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্স)—কোনো সূচকেই অনেক সময় এই জার্নালগুলোর নাম খুঁজে পাওয়া যায় না | আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হলো, নামমাত্র জার্নালে এত বেশিসংখ্যক লেখা না ছাপিয়ে ভালো মানের জার্নালে দু-একটি থিসিস প্রকাশই বুদ্ধিমানের কাজ | ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর (ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো জার্নালের মান বোঝার জন্য স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি) তিনের বেশি, সেসব জার্নালে থিসিস প্রকাশিত হলে খুবই ভালো। এতে শিক্ষার্থীর কাজ ও গবেষণা সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা তৈরি হয় |

যাঁদের ভালো প্রকাশনার সুযোগ নেই, তাঁরা কী করবেন? আমার পরামর্শ হলো, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান বা এ রকম কোনো একটি দেশ থেকে স্নাতকোত্তর করে ফেলতে পারেন | এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালো প্রকাশনা করে ফেলতে পারবেন | আমি নিশ্চিত, এসব দেশের ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলে অস্ট্রেলিয়ার যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির জন্য বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে |

 আইইএলটিএস স্কোর

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ও বৃত্তির আরেকটি প্রধান শর্ত হলো আইইএলটিএস স্কোর | প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই একটা ন্যূনতম আইইএলটিএস স্কোর (৬-এর কম নয়) চায়। যার আইইএলটিএস স্কোর যত ভালো তাকে তত বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় |

এখানেই কিন্তু শেষ নয়। যেহেতু যেকোনো বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ, থিসিস বা প্রতিবেদন ইংরেজিতে লিখতে হয়, তাই এই ভাষাটিতে ভালো দখল থাকলে পিএইচডি বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। আমি যত দূর জানি, যখন স্কাইপে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, তখন ইংরেজিতে কথা বলা ও লেখার দক্ষতাকে খুব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়।

রেফারেন্স ভালো হোক

সিভি তৈরি ও ‘রেফারেন্স লেটার’ নিয়ে কয়েকটি কথা বলে শেষ করব। আমার মনে হয় বেশির ভাগ বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী সিভি তৈরিতে খুব অপেশাদার ও কাঁচা। পিএইচডি করতে আসা একজন শিক্ষার্থীর সিভি খুব তথ্যসমৃদ্ধ হতে হয় | যেই ল্যাবে আবেদন করবে, সেই ল্যাবের সঙ্গে তাঁর বর্তমান ও নিকট ভবিষ্যতে পরিকল্পিত কাজের মিল আছে কি না, থাকলেও কীভাবে আছে, সিভিতে এ বিষয়টা পরিষ্কার করে দিতে পারলে বিষয়টি সুপারভাইজারের নজরে আসবে। অভিজ্ঞতার কথা লিখতে হয় খুব মার্জিতভাবে | অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ কেউ এমন সব অভিজ্ঞতার কথা লেখেন যাঁর সঙ্গে তার সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমের কোনো সংযোগ নেই। ক্লাসে আপনার অবস্থান (যেমন ৫০ জন ছাত্রের ক্লাসে প্রথম অথবা নিজ বিভাগের ৫০০ জন ছাত্রের মধ্যে দশম), স্নাতক বা স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণি আছে কি না, কোনো পুরস্কার পেয়েছেন কি না, পাবলিকেশনের পরিপূর্ণ ‘রেফারেন্স’ ও ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বা সাইটেশন আছে কি না, কোনো সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন কি না (কী ধরনের সম্মেলন? ওয়েবসাইটের ঠিকানা থাকলে ভালো), পোস্টার উপস্থাপন বা বক্তব্য দিয়েছেন কি না, এসব পরিষ্কার করে লেখা ভালো।

অন্যদিকে আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা যেসব রেফারেন্স লেটার পাঠান তার বেশির ভাগই খুব সাদামাটা হয়। কয়েকটি লাইন পড়েই বোঝা যায় খুব অসাবধানে ও গুরুত্বহীনভাবে এটি তৈরি করা হয়েছে | গত কয়েক বছরে আমি যেসব রেফারেন্স লেটার পেয়েছি, তা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের সুপারভাইজারদের দুটি রেফারেন্স লেটারের ধরন আমি ধরে ফেললাম। এর একটি অংশে আছে খুব কাঁচা ইংরেজিতে লেখা রেফারেন্স লেটার। এর কারণ (সম্ভবত) এই চিঠিগুলো সুপারভাইজারেরা নিজে লেখেন না। লেখে ছাত্রছাত্রীরা। শ্রদ্ধেয় সুপারভাইজারেরা শুধু নিজের প্যাডে (বা ই-মেইলে) এটি ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করেন | রেফারেন্স লেটারগুলোর দ্বিতীয় ধরনটি আরও ভয়াবহ—একই রকম বাক্য, একই রকম শব্দ | বোঝা যায়, সুপারভাইজাররা হয়তো রেফারেন্স লেটারের টেমপ্লেট ব্যবহার করেন | যাঁকে দেওয়া হবে তাঁর নাম পরিবর্তন করেন আর বাকি লেখা অভিন্ন থাকে | কিন্তু এখানে ছাত্রছাত্রীদের একটি বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তাঁদের মনে রাখতে হবে রেফারেন্স লেটার বৃত্তিপ্রাপ্তিতে (ডিসিশন মেকিংয়ে) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে | তাই রেফারেন্স লেটার হতে হবে সুন্দর ও শুদ্ধ ইংরেজিতে লেখা, ছাত্রছাত্রীদের অভিজ্ঞতার মার্জিত কিন্তু পরিপূর্ণ মুখপত্র। রেফারেন্স লেটারে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে কোথায় ছাত্র বা ছাত্রীটি দুর্বল ও কোথায় তাঁর দক্ষতা। একই সঙ্গে রেফারেন্স লেটারেই বলতে হবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সঙ্গে ছাত্র বা ছাত্রীর অভিজ্ঞতা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Source:Prothom Alo

Share

তোমরা যারা মেডিকেলে পড়তে চাও

Next Story »

ছয় কিশোরের গণিতের লড়াই

Leave a comment

LifeStyle

  • যে ভিটামিন ক্যানসারের সেল নষ্ট করে!

    19 hours ago

    মরণ রোগ ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কারের জন্য গোটা দুনিয়ার চিকিৎসকরা প্রতিদিনই গবেষণায় নতুন নতুন তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। এই যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ কেয়ার ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় সামনে এল, ...

    Read More
  • নিম পাতার ৭টি জাদুকরী উপকারিতা

    3 days ago

    নিম একটি ঔষধি গাছ যার ডাল, পাতা, রস সবই কাজে লাগে। নিম একটি বহুবর্ষজীবী ও চিরহরিৎ বৃক্ষ। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে ঔষধি গাছ হিসেবে নিমের ব্যবহার হয়ে আসছে ...

    Read More
  • ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াবে যোগ ব্যায়াম

    4 days ago

    ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে যোগ ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা রাখে। এক গবেষণায় দেখা গেছে,  ফুসফুসের ক্রনিক রোগাক্রান্ত রোগীদের ইয়োগার বা যোগব্যায়াম বেশ উপকারী। ‘ চেস্ট’ নামে একটি জার্নালে সম্প্রতি ...

    Read More
  • যে কারণে পায়ের উপর পা তুলে বসবেন না

    4 days ago

    অনেকেই আছেন যারা পায়ের উপর পা তুলে বসতে পছন্দ করেন। তবে বিজ্ঞানীরা বসার এ ভঙ্গিকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কারণ এতে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থাকে। বিজ্ঞানীরা জানান, খুব বেশি সময় ...

    Read More
  • পানিশূন্যতা পূরণ করবে যে খাবার

    7 days ago

    তীব্র গরমে শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে প্রচুর পানি ঝরে যায়। তাই পানিশূন্যতা পূরণে যেসব খাবার ভূমিকা রাখে সেসব খাবার নিয়ে আলোচনা করা হলো : শসা : শসার ...

    Read More
  • হাঁটার উপকারিতা

    1 week ago

    সবচেয়ে সহজ ব্যায়াম হচ্ছে হাঁটা। হাঁটলে প্রাকৃতিকভাবে পাবেন সুস্থতা ও প্রাণবন্ত অনুভূতি। আরও রয়েছে শত উপকার। নিম্নে হাঁটার কিছু উপকারিতা তুলে ধরা হলো। সুস্থ হৃদপিণ্ড, সুন্দর জীবন ...

    Read More
  • সকালের ভালো নাস্তা সারাদিন মনকে প্রফুল্ল রাখে!

    2 weeks ago

    সকালের ভালো নাস্তা সারাদিনের ভালো কাজের জন্য মনকে রাখে প্রফুল্ল। তাই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার সকালের নাস্তা। কিন্তু ডায়েট করার তাগিদে খাওয়ার তালিকা থেকে সকালের নাস্তাই ছেঁটে ...

    Read More
  • স্মৃতিশক্তি ও যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি করে কালোজিরা

    2 weeks ago

    পৃথিবীতে কালোজিরা চিনে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ক্ষীর, পায়েস, পান, পিঠাপুলিসহ বেশকিছু তেলেভাজা খাবারে ভিন্ন স্বাদ আনতে সচরাচর কালোজিরা ব্যবহার হয়।  কিন্তু শুধু খাবাবের ...

    Read More
  • ডিমের চেয়ে বেশি প্রোটিন রয়েছে যে ৫ খাবারে

    2 weeks ago

    আপনি খেতে খুবই ভালোবাসেন, তবে মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে সব কিছু খেয়ে উঠতে পারেন না ৷ আবার প্রোটিনের কথাটাও তো মাথায় রাখতে হবে ৷ একমাত্র ভরসা সেই ...

    Read More
  • স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় অবশ্যই ফুটিয়ে খেতে হবে দুধ

    2 weeks ago

    দুধ কাঁচা খাওয়া ভাল নাকি ফুটিয়ে খাওয়া ভাল, এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। নিজেদের আঙ্গিকে এটিকে ব্যাখ্যাও দিয়ে থাকেন। যে যাই বলুক সরাসরি গোয়ালঘর বা খামার ...

    Read More
  • Read

    More