• Page Views 193

নীল আলোর আগ্নেয়গিরি কাওয়াহ ইজেন

নীল আলোর আগ্নেয়গিরি কাওয়াহ ইজেন। বিশ্বের বৃহত্তম এই নীল আগুনের আগ্নেয়গিরির অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলে।

বিজ্ঞানীরা এ নীল আলোর ব্যাখ্যা দেন এভাবে—এই আগ্নেয়গিরি থেকে সালফার বাষ্প বের হয়। আর সেটি বাতাসে মেশার আগে এই নীলাভ আলো তৈরি হয়।

এই আগ্নেয়গিরিসংলগ্ন এক কিলোমিটারজুড়ে হ্রদের ওপর দিয়ে যখন ধোঁয়া উড়ে যায়, তখন তা আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে।

আলোর খেলা দেখতে চাই অন্ধকার। সম্প্রতি রাতের আঁধারে এ প্রতিবেদকসহ ৪০০ অভিযাত্রীর সুযোগ হয়েছিল এই মোহনীয় দৃশ্য দেখার। এ জন্য অবশ্য পাহাড়ি পথের কষ্ট মেনে নিতে হয়েছে।

মূলত ইন্দোনেশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, কানাডা, ভিয়েতনাম, নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীরা ছিলেন এই দলে। পুরুষের পাশাপাশি ছিলেন নারীরাও। এই অভিযাত্রীদলে বাংলাদেশের ছিলেন ১০ জন প্রতিনিধি।

১৮ হাজার দ্বীপের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় আছে ৪০০ আগ্নেয়গিরি। এর মধ্যে জীবন্ত ১২৭টি। পর্যটকরা তাই বলেন থাকেন, ইন্দোনেশিয়া যেন আগ্নেয়গিরি বা দ্বীপের দেশ।

নীল আলোর এই আগ্নেয়গিরি দেখতে ভাঙতে হয় ক্রমে ওপরে ওঠা ১০ হাজার ফুট পাহাড়ি পথ। এ জন্য ভারী জ্যাকেট, মাথায় বাঁধা টর্চলাইট, ধোঁয়া থেকে বাঁচার মাস্কসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে গত ৩০ নভেম্বর রাতে এই অভিযাত্রীদল যাত্রা শুরু করে। পূর্ব জাভা অঞ্চলের বানিওয়াঙ্গি থেকে প্রথমে শক্তিশালী ইঞ্জিনের প্রাডো গাড়িতে করে পাহাড়ি পথে ছুটতে হলো দুই ঘণ্টা। এরপর হাঁটা শুরু। তিন কিলোমিটার ওই পাহাড়ি বাঁকা পথ মাড়িয়ে তবেই মেলে কাওয়াহ ইজেন আগ্নেয়গিরির।

হাঁটা পথটুকু স্বাভাবিকভাবে চললে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। কিন্তু ২০ মিনিট চলার পরই দেখা গেল, পথে বসে পড়ছেন বহু পর্যটক। তাঁদেরই একজন ইকুয়েডরের তরুণী তোডো, যিনি শুরুতে হাসতে হাসতে উঠছিলেন।

একটু জিরিয়ে তোডো বললেন, ‘আবার শুরু করলাম। ’ তবে বারবারই অন্যদের কাছে জানতে চাইলেন, আর কত দূর? সহযাত্রীরা জানালেন, আরো সামনে, আরো সামনে।

চলতে চলতে পথের স্থানে স্থানে অন্ধকারে গাছের নিচে দেখা গেল বিশেষ ধরনের ট্যাক্সি স্টেশন। মূলত পর্যটকরা হেঁটে পথ চলতে না পারলে ট্যাক্সিতে ওঠার অনুরোধ জানায় তারা। ট্যাক্সিতে একজন যাত্রী বসতে পারে। এর সামনে ও পেছনে একজন করে চালক ও সহকারী থাকে। শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে চলে তারা ট্যাক্সিটি। কখনো পেছন থেকে টেনে ধরতে হয় বা অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। এ জন্যই সহকারী থাকে চালকের।

এই অভিযাত্রীদলের পথনির্দেশক মো. রফিকুল ইসলাম সাত বছর ধরে পর্যটকদের পথ দেখিয়ে ওপরে তুলছেন ও নিচে নামাচ্ছেন। অভ্যাস থাকায় রফিক চলছিলেন কষ্ট ছাড়াই। তিনি জানান, প্রায় ২৪০টি ট্যাক্সি আছে এই পথে।

হাঁটতে হাঁটতে নাভিশ্বাস উঠছিল অস্ট্রেলিয়ার পার্থ থেকে প্রথমবারের মতো নীল আলোর আগ্নেয়গিরি দেখতে আসা স্টফিসের। ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যেও ঘেমে যাওয়ায় পথনির্দেশক রফিকের উদ্দেশে তিনি বলছিলেন, ‘শখ দরদর করে ঘাম হয়ে শরীর বেয়ে নামছে। আর কত দূর?’

রফিক কিন্তু হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘দেড় কিলোমিটার। বেশি সময় লাগবে না। ’

গরম পোশাক, টুপি, হাতমোজা খুলে চলতে চলতে দেখা গেল, একে একে ছয়জন পর্যটক শুয়ে পড়েছেন। একজনকে তোলা হচ্ছিল ট্যাক্সিতে। ট্যাক্সিতে উঠে প্রথমে খুশিই হয়েছিলেন পর্তুগালের হিমেরি হায়ান। তবে পরক্ষণেই চোখে-মুখে নেমে আসে ভয়, চলতে চলতে যদি ডানে বা বাঁয়ের খাদে পড়ে যায়!

জানা গেল, কাওয়াহ ইজেন আগ্নেয়গিরির লাভামুখ ১০০টি। ২০০২ সালে এটি দিয়ে সর্বশেষ অগ্ন্যুত্পাত হয়েছিল। এরপরই এর বিভিন্ন অংশ থেকে অনবরত সালফার বের হচ্ছে। এই সালফারের অংশ স্থানীয় লোকজন প্রতি রাতে সংগ্রহ করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে। তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ মার্কিন ডলারের সমান আয় করতে পারে।

অভিযাত্রীদের সঙ্গে তাই স্থানীয় এই সালফার ব্যবসায়ীদের দেখা মিলল। তারা প্রতি রাতেই সেখানে ছুটে যায়।

শেষ চূড়ায় পৌঁছার আগে ঠাণ্ডা পানীয়, বিস্কুট ও সিগারেটের দোকান চোখে পড়ল। সেখানে বেঞ্চগুলো দখল করে ঘুমে অচেতন অসংখ্য পর্যটক। তাঁরা নীল আলো দেখে ফিরছেন। কেউ বা মাটিতে বসেছেন। কেউ বনের ধারে জিরিয়ে নিচ্ছেন।

অন্ধকার পথে টর্চের আলোয় চলতে চলতে ঘাম ঝরছিলই। সঙ্গী বাংলাদেশের ধূসর আহমেদ ও মইন আলী রিফাতেরও একই অবস্থা। ধূসর বললেন, ‘মনে হচ্ছে নেমে যাই। ’

তখন পথনির্দেশক রফিক জানালেন, ১০০ মিটার গেলেই সারি সারি গাছের নিচে সমতল। রফিকের যেন প্রতিটি ইঞ্চি পথ মুখস্থ। সত্যি ১০০ মিটার পেরোনোর পরই দুটো পা সমানতালে চলছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই দেখা মিলল নীল আলোর ঝলকানি। ৬০০ মিটার উঁচুতে তখন সবাই পথের ক্লান্তি ভুলে উত্ফুল্ল।

ড্রোন চালিয়ে চিত্র ধারণ করছিলেন জাপান থেকে আসা সোতুমি হারু। নিচে গর্তের কাছে উড়ছিল নীলাভ আলো ও ধোঁয়া। তার পাশেই এক কিলোমিটার প্রশস্ত হ্রদ, সেখানে নীল আলো আরো উজ্জ্বল। গবেষকদের মতে, এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অম্ল হ্রদ (এসিডিক লেক)।

পেরু থেকে আসা সমিম সিমার বললেন, ‘আমি উচ্ছ্বসিত, এমন নীল আলোর রাশি আর কখনো দেখিনি। শিশুরা যেভাবে বিস্মিত হয়, আমিও সেই রকম অনুভব করছি। ’

ভোরের আলো ফোটার পর ছোট ছোট পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে নিচে নামতে হলো আরো সতর্ক হয়ে। শরীরে তখন ঘাম নেই। নামার পথে আধাঘণ্টা হেঁটেই গাড়ি রাখার স্থানে পৌঁছা সম্ভব হলো। চোখে পড়ল পাশের সারি সারি আগ্নেয়গিরি।

সূত্র:কালের কণ্ঠ

Share

প্রাচীনতম রেইন ফরেস্ট ‘তামান নেগারা’

Next Story »

আধুনিকতার ‘কল্পরাজ্য’ শাংহাই

Leave a comment

LifeStyle

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঁচামরিচ!

    3 weeks ago

    রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হলো কাঁচামরিচ। রান্নায় বা সালাদে তো বটেই, কেউ কেউ ভাতের সঙ্গে আস্ত কাঁচামরিচ খেতেও পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে ...

    Read More
  • নিম পাতার গুণাগুণ

    3 weeks ago

    নিমগাছের পাতা, তেল ও কাণ্ডসহ নানা অংশ চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নানা রোগের উপশমের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এ গাছের। এ লেখায় থাকছে তেমনই কিছু ব্যবহার। ম্যালেরিয়া ...

    Read More
  • ডায়েটের কিছু ভুল

    3 weeks ago

    আজকাল মোটা হওয়া যেন কারোই পছন্দ না। কিন্তু ডায়েট করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না অনেকেই। কারণ, ডায়েটের সময় আমরা এমন কিছু ভুল করি যেগুলোর জন্য মেদ কমাতো ...

    Read More
  • পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস

    3 weeks ago

    আনারস শুধু সুস্বাদের জন্যই নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। রসালো এ ফল জুস তৈরি করেও খাওয়া যায়। সারাদিন রোজা রেখে সুস্থ থাকতে অসংখ্য পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস যেমন ...

    Read More
  • অ্যাসিডিটিতে এখন যেমন খাবার…

    3 weeks ago

    রোজার মাসে সবাই যেন খাবারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। সারা দিন না খাওয়ার অভাবটুকু ইফতারে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কি এই প্রতিযোগিতা? কে কত খেতে বা রান্না করতে পারে। ...

    Read More
  • ইফতারে স্বাস্থ্যকর ফল পেয়ারা

    3 weeks ago

    প্রতিদিনের ইফতারে ভাজাপোড়া কম খেয়ে বিভিন্ন ফল খাওয়া উত্তম বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই আপনার ইফতারে থাকতে পারে অতি পরিচিত এই ফলটি। প্রতিদিন মাত্র ১টি পেয়ারা আপনার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় লেবুর শরবত

    3 weeks ago

    গরমে যখন তীব্র দাবদাহে ক্লান্ত, ঠিক তখনই ইফতারে এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে প্রাণটা জুরিয়ে যায়। শুধু শরবত হিসেবেই নয়, ওজন কমাতেও অনেকেই লেবুর শরবত খান। কিন্তু ...

    Read More
  • অ্যালার্জি ও সর্দি হয় যে কারণে

    3 weeks ago

    সাধারণত যারা বেশি পরিমাণে ঘরের বাইরে থাকেন তাদের মধ্যে সর্দি বা এলার্জির পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে ঘরের ভেতরে অনেক বস্তু রয়েছে যেগুলো কারো মধ্যে এলার্জি ...

    Read More
  • প্রতিদিন কাঁচা পেঁয়াজ খেলে কি উপকার হয়?

    4 weeks ago

    ‘যত কাঁদবেন, তত হাসবেন’- পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এই কথাটা দারুণভাবে কার্যকরী। কারণ এই সবজি কাটতে গিয়ে চোখ ফুলিয়ে কাঁদতে হয় ঠিকই। কিন্তু এই প্রাকৃতিক উপাদানটি শরীরেরও কম উপকার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় হলুদ

    1 month ago

    রান্নাে মশলা হিসেবে অতি পরিচিত হলুদ। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রনের পাশাপাশি এতে আছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেণ্ট, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিকারসিনোজেনিক, অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ...

    Read More
  • Read

    More