পৃথিবীর মঞ্চে বাংলাদেশি গবেষক

আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (ACS) হলো রসায়নের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সংগঠন। প্রায় দেড় শ বছর পুরোনো এই সংগঠন বছরে দুবার ন্যাশনাল মিটিং আয়োজন করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে এই মিটিংগুলো অনুষ্ঠিত হয়। তাবৎ দুনিয়ায় রসায়নের যত শাখা আছে, সব শাখার নবীন-প্রবীণ গবেষকেরা এই সম্মেলনে আসেন। তাদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। একে অপরের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। গবেষণার প্রচুর আইডিয়া শেয়ার করেন। এক সপ্তাহ জুড়ে প্রায় ১০ হাজার গবেষকদের এক অতুলনীয় মিলনমেলায় জ্বলজ্বল করে সে সম্মেলন।

২০১২ সালে প্রথমবারের মতো এসিএস (ACS) কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করি। স্টকহোম থেকে এসেছিলাম সে বছর। তারপর অবশ্য সেখান থেকে আরও কয়েকটি সম্মেলনে আসি। প্রতিটি কনফারেন্সে আসার সময় একধরনের উদ্দীপনা কাজ করত। নানান দেশের বড় বড় গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হতো। দেখা মিলত নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের। প্রাণশক্তি জাগানোর এক উৎস হয়ে থাকত এই সম্মেলনগুলো।
যতবার এসিএস কনফারেন্সে আসতাম, ততবারই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েদের খুঁজতাম। চারদিকে শুধু চীন-ভারতের ছেলেমেয়েদের চোখে পড়ত। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের দেখা পেতাম না খুব। একধরনের হাহাকার ও শূন্যতা কাজ করত। দু-একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে, একটা সীমাহীন আনন্দ লাগত।
এ মাসের ২০ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হলো আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির ২৫৪তম সম্মেলন। এ নিয়ে পাঁচটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তবে এবারের সম্মেলন আমার কাছে সবচেয়ে আলাদা। এ বছরের সম্মেলন স্মরণে রাখার মতো। এ বছর খুঁজে খুঁজে প্রায় ১৫ জন বাংলাদেশি ছেলেমেয়ে পেয়ে গেলাম। এটা যে কত আনন্দের, সেটা বোঝানো যাবে না। এত বড় একটা সম্মেলনে বাংলাদেশের এতজন গবেষক অংশগ্রহণ করেছেন, সেটা যেনতেন কথা নয়। তাদের সবাই রসায়নের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা করছেন। কেউ পিএইচডি করছেন। কেউ করছেন পোস্টডক। কেউ বা আবার গবেষণা করছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। এই সম্মেলনে সবাই তাদের গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করেছেন।
তাদের কেউ এসেছেন ফ্লোরিডা থেকে, কেউ এসেছেন আইওয়া থেকে, কেউ বা এসেছেন বোস্টন থেকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা এই ছেলেমেয়েগুলো বিদেশে গবেষণা করছেন। তাদের বেশির ভাগই, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থী। কয়েকজনের কথা না বললেই নয়। মং সানো মারমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি করে পোস্টডক করেছেন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে। বর্তমানে তিনি গবেষণা করছেন ‘ডিএনএ’ নিয়ে। তিনি ছিলেন তাঁর ব্যাচের প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া ছাত্র। এমন আরও ছিলেন নাজমুল হোসেন, সাদিয়া আফরিন খান, রেজাউল করিম। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যাচের ‘প্রথম শ্রেণিতে প্রথম’ হওয়া শিক্ষার্থী। জগৎময় দাস এসেছিলেন টরন্টো থেকে। এই মেধাবী গবেষক কাজ করছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মাতৃভূমিতে উন্নত গবেষণার সুযোগ না থাকায় তাঁরা আজ উন্নত দেশে মেধার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। তাদের প্রত্যেকের ভাবনায় আছে বাংলাদেশ। দেশের শিক্ষা ও গবেষণার দুরবস্থা তাদের বিচলিত করে। সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশি গবেষকেরা মিলে একটি আড্ডার আয়োজন করা হয়। আড্ডা শুরু হতে না হতেই দেশের বহু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়। দেশের তরুণদের আরও বেশি করে উদ্বুদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সবাই। এঁদের সবাই মনে করেন, দেশ থেকে প্রচুর সংখ্যক ছেলেমেয়ে যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আসবে, তখন এর পজিটিভ একটা প্রভাব পড়বে সেখানে। উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েদের মেধার বিকাশের জন্য উন্নত দেশে আসতেই হবে। চীন ও ভারত এভাবেই দাঁড়াচ্ছে। আমরাও পিছিয়ে থাকব না। তবে দেশের নীতিনির্ধারকদেরও হতে হবে বিবেকবান। দেশে গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক এবং অর্থ। বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোনো দিন গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় না।
পৃথিবীর এত বড় এক মঞ্চে বাংলাদেশের মেধাবী গবেষকদের এমন উপস্থিতি ও মিলনমেলা, দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হবে এক অনুপ্রেরণার উৎস। এই করি কামনা। অগ্রজদের দেখে তোমরা প্রস্তুত হও, দৃঢ় প্রত্যয়ে!

ড. রউফুল আলম: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: <rauful.alam15@gmail.com>, ফেসবুক: <www.facebook.com/rauful15>

 

Share

বন্যার্তদের জন্য কানাডা প্রবাসী বাঙালিদের তহবিল সংগ্রহ

Next Story »

কানাডার ১৫০ তম জন্মদিন উপলক্ষে বিসিসিএস আর বর্ণাঢ্য আয়োজন

Leave a comment

LifeStyle

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঁচামরিচ!

    4 months ago

    রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হলো কাঁচামরিচ। রান্নায় বা সালাদে তো বটেই, কেউ কেউ ভাতের সঙ্গে আস্ত কাঁচামরিচ খেতেও পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে ...

    Read More
  • নিম পাতার গুণাগুণ

    4 months ago

    নিমগাছের পাতা, তেল ও কাণ্ডসহ নানা অংশ চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নানা রোগের উপশমের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এ গাছের। এ লেখায় থাকছে তেমনই কিছু ব্যবহার। ম্যালেরিয়া ...

    Read More
  • ডায়েটের কিছু ভুল

    4 months ago

    আজকাল মোটা হওয়া যেন কারোই পছন্দ না। কিন্তু ডায়েট করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না অনেকেই। কারণ, ডায়েটের সময় আমরা এমন কিছু ভুল করি যেগুলোর জন্য মেদ কমাতো ...

    Read More
  • পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস

    4 months ago

    আনারস শুধু সুস্বাদের জন্যই নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। রসালো এ ফল জুস তৈরি করেও খাওয়া যায়। সারাদিন রোজা রেখে সুস্থ থাকতে অসংখ্য পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস যেমন ...

    Read More
  • অ্যাসিডিটিতে এখন যেমন খাবার…

    4 months ago

    রোজার মাসে সবাই যেন খাবারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। সারা দিন না খাওয়ার অভাবটুকু ইফতারে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কি এই প্রতিযোগিতা? কে কত খেতে বা রান্না করতে পারে। ...

    Read More
  • ইফতারে স্বাস্থ্যকর ফল পেয়ারা

    4 months ago

    প্রতিদিনের ইফতারে ভাজাপোড়া কম খেয়ে বিভিন্ন ফল খাওয়া উত্তম বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই আপনার ইফতারে থাকতে পারে অতি পরিচিত এই ফলটি। প্রতিদিন মাত্র ১টি পেয়ারা আপনার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় লেবুর শরবত

    4 months ago

    গরমে যখন তীব্র দাবদাহে ক্লান্ত, ঠিক তখনই ইফতারে এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে প্রাণটা জুরিয়ে যায়। শুধু শরবত হিসেবেই নয়, ওজন কমাতেও অনেকেই লেবুর শরবত খান। কিন্তু ...

    Read More
  • অ্যালার্জি ও সর্দি হয় যে কারণে

    4 months ago

    সাধারণত যারা বেশি পরিমাণে ঘরের বাইরে থাকেন তাদের মধ্যে সর্দি বা এলার্জির পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে ঘরের ভেতরে অনেক বস্তু রয়েছে যেগুলো কারো মধ্যে এলার্জি ...

    Read More
  • প্রতিদিন কাঁচা পেঁয়াজ খেলে কি উপকার হয়?

    4 months ago

    ‘যত কাঁদবেন, তত হাসবেন’- পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এই কথাটা দারুণভাবে কার্যকরী। কারণ এই সবজি কাটতে গিয়ে চোখ ফুলিয়ে কাঁদতে হয় ঠিকই। কিন্তু এই প্রাকৃতিক উপাদানটি শরীরেরও কম উপকার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় হলুদ

    4 months ago

    রান্নাে মশলা হিসেবে অতি পরিচিত হলুদ। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রনের পাশাপাশি এতে আছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেণ্ট, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিকারসিনোজেনিক, অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ...

    Read More
  • Read

    More