• Page Views 115

মাকে চমক দেওয়ার ইচ্ছা পূরণ হলো না রূপার

তিলে তিলে জীবনটা গড়ছিলেন রূপা খাতুন। পড়ালেখার খরচ জোগাতে টিউশনি করেছেন, কাজ করেছেন পোশাক কারখানায়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তবে একবারের জন্যও নিজের লক্ষ্য থেকে পিছু হটেননি তিনি। বেতন বাড়ানোর কথা মাকে জানিয়ে চমক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর।

কিন্তু সেটা আর হলো না রূপার (২৯)। সবকিছু গুছিয়ে আনার আগেই তাঁকে হত্যা করা হলো। চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে তাঁকে হত্যা করে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রাখা হয়।

সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামে রূপার বাড়ি। বাড়ির ঘর ও আসবাবে দারিদ্র্যের ছাপ।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিকে বৃত্তি পাওয়া রূপা ২০০৪ সালে স্থানীয় জাফর ইকবাল টেকনিক্যাল গার্লস হাইস্কুল থেকে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ২০০৬ সালে জেআই টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে একই বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি চলে যান বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজে এলএলবিতে শেষ বর্ষে পড়াশোনা করতেন।

বাবা ছিলেন কৃষক। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে রূপা তৃতীয়। বড় ভাই মো. হাফিজুর রহমান পড়েছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। আর মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না–পেরোতেই বিয়ে হয়ে যায় বড় বোন জেসমিন খাতুনের। তবে রূপার এই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না।

জেসমিন খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নবম শ্রেণি থেকেই রূপা টিউশনি করত। বগুড়ায় গিয়ে যখন মেয়েদের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত, তখনো টিউশনি করত।’

 রূপার ছোট বোন পপি খাতুন উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ২০০৮ সালে নাটোরে খালার বাসায় চলে যান। সেখান থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক পাস করেন। রূপা এবং তিনি একই সঙ্গে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রমোশনাল ডিভিশনে চাকরি করতেন। রূপার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল শেরপুরে আর পপির কর্মস্থল ছিল গাজীপুরে। বুধবার (গতকাল) কোম্পানির বারিধারার অফিস থেকে মাসের বেতন নিয়ে মিরপুর থেকে দুই বোন পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করবেন—এমনটাই কথা ছিল।

বোনের মৃত্যুর খবরে পপি মঙ্গলবারই বাড়ি চলে এসেছেন। কাঁদছেন অনবরত। পপি বলছিলেন, পরিবারের আর্থিক অনটন যখন চরমে, তখন দুই বোন মিলে ঢাকায় চলে যান। তত দিনে তাঁর স্নাতক শেষ হয়েছে। রূপার শেষ হয়েছে স্নাতকোত্তর। সাভারের একটি ফ্যাশন হাউসে মান নিয়ন্ত্রকের কাজ নেন দুই বোন। এভাবে চলতে চলতেই একদিন আইন নিয়ে পড়া শুরু করেন রূপা। ২০১৫ সাল থেকে কাজ শুরু করেন বহুজাতিক এই কোম্পানিতে।

পপি বলেন, সর্বশেষ মাসিক ১৮ হাজার টাকা করে বেতন পেতেন দুই বোন। এই মাস থেকেই তাঁদের বেতন বাড়ানোর কথা। রূপার ইচ্ছা ছিল বেতন বাড়লে মাকে চমক দেবেন।

বৃহস্পতিবার দিনের কাজ শেষ করেই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে শেরপুর থেকে বগুড়া গিয়েছিলেন রূপা। রূপার সঙ্গে কাজ করতেন সাবিহা সুলতানা। তাঁরা শেরপুরে একসঙ্গেই থাকতেন। গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, পণ্যের বাজারজাতের জন্য তাঁরা একসঙ্গেই একটি অনুষ্ঠান করেন। এরপর রূপা জানান, তিনি আর বাসায় যাবেন না। এখান থেকেই বগুড়া চলে যাবেন।

রূপা বগুড়ায় গিয়ে উঠেছিলেন তাঁর সেই আগের হোস্টেলের মালিকের বাসায়। হোস্টেলের মালিকের স্ত্রী মঞ্জু আরা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতে সে এল। সকালে উঠে একটা পরীক্ষা দিতে গেল। দুপুরে এসে বিকেলে বের হয়ে গেল। এরপর আর কিচ্ছু জানি না। পত্রিকায় দেখলাম শেষ খবর।’

গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর বন এলাকা থেকে মধুপুর পুলিশ রূপার লাশ উদ্ধার করে। বেওয়ারিশ হিসেবে পুলিশ টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে লাশ দাফন সম্পন্ন করে। সোমবার রূপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান একটি পত্রিকায় বেওয়ারিশ লাশ দাফনের সংবাদ দেখে মধুপুর থানায় এসে তাঁর লাশ শনাক্ত করেন।

নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাঁর মা হাসনাহেনা বেগমের নাওয়াখাওয়া বন্ধ। মূর্ছা যাচ্ছেন বারবার। তাঁকে তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সেখানে গেলে দেখা যায়, হাসনাহেনা বেগম অনবরত কাঁদছিলেন।

হাসনাহেনা বেগম বলেন, ‘আমি কেবল কইতে গেছি তুই রাতে এমনে যাইস না।’ হাসনাহেনা বেগমের কান্নার শব্দ বাড়তে থাকে। বলেন, ‘আমার দরদি বেটি, কষ্ট করে লেখাপড়া শিখছে। আমার সোনার টুকরাটারে এমনে মারল। আমি বিচার চাই। তাদের ফাঁসি না দিলে মাইনব না।’

Share

‘‌ঈদে জঙ্গিদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে’

Next Story »

চট্টগ্রাম টেস্টে কি একাদশে জায়গা পাবেন মুমিনুল?

Leave a comment

LifeStyle

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করবে জলপাই পাতা!

    5 hours ago

    জলপাই গাছ এক ধরণের চিরহরিৎ ফল । ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, এশিয়া, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার কিছু অংশে এটা ভাল জন্মে। জলপাই গাছ ৮-১৫ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। এর পাতা ...

    Read More
  • মুখের দুর্গন্ধ দূর করবে বেদানার খোসা

    6 hours ago

    মুখে গন্ধ হলে ধারে কাছে কেউই ঘেঁষতে চায় না। এমনকী মনের মানুষটাও যেন তখন দূরে দূরে থাকতে চায়! দুই বেলা দাঁত মেজেও কোনও সমাধান পাওয়া না গেলে, ...

    Read More
  • শীত সামলান ইচ্ছেমতো

    1 day ago

    ইচ্ছেমতো ফ্যাশন, এটাই যেন শীতের এক মজা। হুডি বা সোয়েটারে সহজে সামলে নিতে পারেন শীত। বেড়াতে গিয়েও ফুরফুরে থাকা যায়। হোক সে জঙ্গলে তাঁবুবাস বা রাতের বারবিকিউ—স্মার্ট ...

    Read More
  • শীতে চুলের যত্নে জেনে নিন

    1 day ago

    শীতকালে চুলের যত্নে অবহেলার কারণে ফাংগাল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাছাড়া, শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকার কারণে আমাদের চুলও শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যায়। পাশাপাশি বাইরের ধুলাবালির ...

    Read More
  • চোখ ভালো রাখার ৫ উপায়

    1 day ago

    অফিসে কিংবা বাড়ি ফিরেও কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকেন। তারপর হাতের মুঠোয় ফোনটার দিকে চোখ তো রয়েছেই। এভাবেই ধীরে ধীরে আপনার চোখের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। দুর্বল ...

    Read More
  • শুক্রাণু বাছাইয়ে বাড়বে গর্ভধারণের সম্ভাবনা!

    1 day ago

    আজাকাল অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেশ কয়েক বারের চেষ্টাতেও সন্তান ধারণ করতে সক্ষম হননা বহু নারী। এই সমস্যার সমাধানেই আবিষ্কৃত হয়েছে এমন একটি যন্ত্র- যা সবল শুক্রাণু ...

    Read More
  • এক সপ্তাহে ১০ কিলোগ্রাম ওজন ঝরাবে সেদ্ধ ডিম!

    2 days ago

    মেদ কমানোর জন্য অনেক কিছু করি আমরা। কখনও কঠিন ডায়েট, তো কখনও সকাল হলেই দৌড়, জিমে গিয়ে নানা ব্যায়াম। তবুও ফলাফল শূন্য। কোনও এক্সারসাইজ, কোনও ডায়েটই কাজে ...

    Read More
  • বালিশ ছাড়া ঘুমানোর উপকারিতা

    2 days ago

    শুধু রাতে ঘুমানোর জন্য নয়, ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতেও বালিশের ভূমিকা অস্বীকার করার নয়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, হ্যাঁ, সৌন্দর্য বাড়াতে ব্যবহার করতেই পারেন, কিন্তু মাথার নিচে বালিশ গুঁজে ...

    Read More
  • গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ও বমি ভাব দূর করবে দারচিনি

    2 days ago

    গা গুলানো বা বমি বমি ভাব হলেই প্রথমে আসে লেবু-পানির কথা। কিন্তু এই সমস্যার আরও ভাল একটি সমাধান রয়েছে। মাত্র একটু দারচিনিতেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে ...

    Read More
  • ক্যান্সার কোনো রোগ নয়, শব্দটি ‘মিথ্যা’

    2 days ago

    ক্যান্সার শব্দটি ‘মিথ্যা’ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আধুনিক বিশ্বের ক্যান্সার শব্দটা এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে যে এটি বৃদ্ধ, তরুণ, শিশুসহ সবাইকে প্রভাবিত করেছে। কিছু শ্রেণি ...

    Read More
  • Read

    More