• Page Views 69

সরকারের ইচ্ছাই পূরণ করছে ইসি

সরকারের ইচ্ছাপূরণেই কাজ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসির বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন এই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

ইসি সূত্র জানায়, সরকারি দল আওয়ামী লীগ গত এপ্রিলে ইসির বৈঠক করে তিনটি দাবি জানিয়েছিল। সেগুলো হলো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাংসদদের প্রচারের সুযোগ দেওয়া, সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন না আনা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারের আগে তা আরও পর্যালোচনা করা। ইসির একজন কমিশনারের আপত্তির মুখে সিটি নির্বাচনে সাংসদদের প্রচারের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। আরপিও সংস্কারকাজও আরও পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন না আনার দাবি পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশে পূরণ করেছে ইসি।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল। ইসি ঢাকা থেকে একজন যুগ্ম সচিবকে সমন্বয়কারী করে খুলনায় পাঠায়। বিএনপির দাবি ছিল, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. হুমায়ূন কবীর এবং গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহার করা। ইসি সেই দাবি আমলে নেয়নি।

আবার অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম ব্যবহার, ‘না’ ভোটের বিধান আবার চালু, প্রবাসীদের ভোটার ও ভোটাধিকার দেওয়া, বিভিন্ন ধাপে সংসদ নির্বাচন করে এক দিনে ফলাফল ঘোষণা করা, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত, প্রস্তাব ও দাবি এসেছিল। এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল—এই অজুহাতে ইসি সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে।

এসব পদক্ষেপের কারণে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন এই সংস্থা এখন সরকারের ইচ্ছাপূরণে বা সরকারের দেখানো পথে হাঁটছে—এমন আলোচনা সামনে এসেছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ইসির বিভিন্ন পদক্ষেপে মানুষের মনে সন্দেহ জেগেছে। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, সরকারি দল বলল আর ইসি তা করল। ইসি কীভাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে, তা তাদের ঠিক করতে হবে।

নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের জবরদখল, প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার ঘটনা ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সর্বশেষ খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসির দুর্বলতা প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। গণগ্রেপ্তার এবং বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে এক পক্ষকে মাঠছাড়া করা, পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, বিভিন্ন কেন্দ্রে বুথ দখল করে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা, বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মে নীরবতার কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে ইসিকে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি শুরু থেকে বলে এসেছে, এই কমিশন নিরপেক্ষ নয়। এখন তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপে প্রমাণিত হচ্ছে, সরকার যা যা চাইছে, ইসি তা-ই করছে। বিএনপির কোনো দাবির প্রতি তারা কর্ণপাত করছে না। ক্ষমতাসীনদের নীলনকশা বাস্তবায়নে কাজ করছে ইসি।

তবে সরকারের ইচ্ছাপূরণে ইসি কাজ করছে—এ কথা মানতে নারাজ ইসির সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের ইচ্ছাপূরণে ইসি কাজ করছে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইসির অংশীজন। তারা যেকোনো বিষয়ে প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণযোগ্য মনে হলে ইসি বিবেচনা করে।

তড়িঘড়ি করে বিধি সংশোধন

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল গত ১২ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাংসদের প্রচারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। এর দেড় মাসের মাথায় অংশীজনদের কারও সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা সংশোধন করে নির্বাচন কমিশন। একজন নির্বাচন কমিশনার আপত্তি করলেও সেটা আমলে নেওয়া হয়নি।

সীমানা নিয়ে পিছু হটা

গত জুলাইয়ে ইসির ঘোষিত কর্মপরিকল্পনায় আগামী নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছিল। এ জন্য নতুন করে আইন করার উদ্যোগও নিয়েছিল ইসি। তখন আওয়ামী লীগ সংলাপে অংশ নিয়ে জানিয়েছিল, তারা আগামী নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তনের বিপক্ষে। এরপর ইসির নতুন আইন করার উদ্যোগ থেমে যায়।

বিদ্যমান আইনে ৪০টি সংসদীয় আসনে পরিবর্তন প্রস্তাব করেছিল ইসি। প্রভাবশালী মন্ত্রী-সাংসদের অনেকে এই পরিবর্তনের প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হন। শুনানি শেষে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৫টি আসনে পরিবর্তন আনে ইসি। যেসব মন্ত্রী ও সাংসদ তাঁদের সংসদীয় এলাকার সীমানায় পরিবর্তন প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তাঁদের এলাকায় পরিবর্তন প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।

ঝুলে গেছে আইন সংস্কার

ইসির ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বরে আইন সংস্কারের খসড়া প্রস্তুত এবং এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কারসংক্রান্ত কমিটি আরপিওতে ৩৫টি সংশোধনী আনার সুপারিশ করেছিল। এগুলো নিয়ে গত ৯ ও ১২ এপ্রিল দুই দফা আলোচনা করে কমিশন। এরপর ১২ এপ্রিল বিকেলে আওয়ামী লীগ ইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আরপিও সংস্কারের খসড়া যেন আরও পর্যালোচনা করা হয়। এ দাবি জানানোর ঘণ্টা দুয়েক আগেই ইসি সিদ্ধান্ত নেয় আরও পর্যালোচনা করার। সুপারিশগুলো আবার কমিটিতে ফেরত পাঠানো হয়। আগামী নির্বাচনের আগে আইন সংস্কার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।

সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছর নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, নারীনেত্রী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ করে ইসি। এতে আসা সুপারিশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে—সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রস্তাব, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল প্রস্তাব এবং ইসির এখতিয়ারভুক্ত প্রস্তাব। এর মধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম ব্যবহার করা না-করা, ‘না’ ভোটের বিধান আবার চালু ও প্রবাসীদের ভোটার করার মতো আলোচিত সুপারিশগুলোকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলছে ইসি।

আরপিওতে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সেনাবাহিনীকে বিচারিক (ম্যাজিস্ট্রেসি) ক্ষমতা দেওয়ার দাবি ছিল বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। আওয়ামী লীগসহ তাদের সমমনা কয়েকটি দলের অবস্থান এর বিপক্ষে। বিএনপির দাবি পূরণ করতে হলে আরপিও সংশোধন করতে হবে। সরকার না চাইলে তা সম্ভব নয়। সীমানা পুনর্নির্ধারণ বাদে একইভাবে অন্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও আইন সংশোধনের প্রশ্ন আছে। তবে ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি আরপিও সংশোধনের যে প্রাথমিক খসড়া করেছে, তাতে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সংজ্ঞাভুক্ত করার কোনো সুপারিশ নেই।

আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হোক। বিএনপি এর বিপক্ষে। আরপিও সংশোধনীর খসড়ায় ইভিএমে ভোট নেওয়ার সুযোগ রাখার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবেও ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু ইসি তা আমলে নিচ্ছে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। এ জন্য যা যা প্রয়োজন তা তাদের করতে হবে, সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নিতে হবে। যেগুলো সরকারের হাতে, সেগুলো সরকারকে প্রস্তাব দিতে হবে। কিন্তু ইসির পুরো আচরণ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তারা বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা যে আচরণ করছে, তা হতাশাব্যঞ্জক।

সূত্র:প্রথম আলো

Share

গোপনে চলছে কুমারী মা ও ধর্ষিতাদের সেবা

Next Story »

ডেসটিনি বিলুপ্তি নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ আরও ৪ সপ্তাহ স্থগিত

Leave a comment

LifeStyle

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঁচামরিচ!

    3 months ago

    রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হলো কাঁচামরিচ। রান্নায় বা সালাদে তো বটেই, কেউ কেউ ভাতের সঙ্গে আস্ত কাঁচামরিচ খেতেও পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে ...

    Read More
  • নিম পাতার গুণাগুণ

    3 months ago

    নিমগাছের পাতা, তেল ও কাণ্ডসহ নানা অংশ চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নানা রোগের উপশমের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এ গাছের। এ লেখায় থাকছে তেমনই কিছু ব্যবহার। ম্যালেরিয়া ...

    Read More
  • ডায়েটের কিছু ভুল

    3 months ago

    আজকাল মোটা হওয়া যেন কারোই পছন্দ না। কিন্তু ডায়েট করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না অনেকেই। কারণ, ডায়েটের সময় আমরা এমন কিছু ভুল করি যেগুলোর জন্য মেদ কমাতো ...

    Read More
  • পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস

    3 months ago

    আনারস শুধু সুস্বাদের জন্যই নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। রসালো এ ফল জুস তৈরি করেও খাওয়া যায়। সারাদিন রোজা রেখে সুস্থ থাকতে অসংখ্য পুষ্টিগুণে ভরপুর আনারসের জুস যেমন ...

    Read More
  • অ্যাসিডিটিতে এখন যেমন খাবার…

    3 months ago

    রোজার মাসে সবাই যেন খাবারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। সারা দিন না খাওয়ার অভাবটুকু ইফতারে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কি এই প্রতিযোগিতা? কে কত খেতে বা রান্না করতে পারে। ...

    Read More
  • ইফতারে স্বাস্থ্যকর ফল পেয়ারা

    3 months ago

    প্রতিদিনের ইফতারে ভাজাপোড়া কম খেয়ে বিভিন্ন ফল খাওয়া উত্তম বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই আপনার ইফতারে থাকতে পারে অতি পরিচিত এই ফলটি। প্রতিদিন মাত্র ১টি পেয়ারা আপনার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় লেবুর শরবত

    3 months ago

    গরমে যখন তীব্র দাবদাহে ক্লান্ত, ঠিক তখনই ইফতারে এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে প্রাণটা জুরিয়ে যায়। শুধু শরবত হিসেবেই নয়, ওজন কমাতেও অনেকেই লেবুর শরবত খান। কিন্তু ...

    Read More
  • অ্যালার্জি ও সর্দি হয় যে কারণে

    3 months ago

    সাধারণত যারা বেশি পরিমাণে ঘরের বাইরে থাকেন তাদের মধ্যে সর্দি বা এলার্জির পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে ঘরের ভেতরে অনেক বস্তু রয়েছে যেগুলো কারো মধ্যে এলার্জি ...

    Read More
  • প্রতিদিন কাঁচা পেঁয়াজ খেলে কি উপকার হয়?

    3 months ago

    ‘যত কাঁদবেন, তত হাসবেন’- পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এই কথাটা দারুণভাবে কার্যকরী। কারণ এই সবজি কাটতে গিয়ে চোখ ফুলিয়ে কাঁদতে হয় ঠিকই। কিন্তু এই প্রাকৃতিক উপাদানটি শরীরেরও কম উপকার ...

    Read More
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় হলুদ

    3 months ago

    রান্নাে মশলা হিসেবে অতি পরিচিত হলুদ। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রনের পাশাপাশি এতে আছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেণ্ট, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিকারসিনোজেনিক, অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ...

    Read More
  • Read

    More